ভূমিকম্পে মিয়ানমারে মৃত্যু ২ হাজার ছাড়িয়েছে, জীবিত উদ্ধার আরও ৪ জন

ভূমিকম্পে মিয়ানমারে মৃত্যু ২ হাজার ছাড়িয়েছে, জীবিত উদ্ধার আরও ৪ জন
মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সোমবার দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ৬৫-তে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে, আহতের সংখ্যা বলেছে প্রায় ৪ হাজার, নিখোঁজ ২৭০ জন।
দুই হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পের তিনদিন পরও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের জীবিত বের করতে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে উদ্ধারকারীরা।
সোমবারও মিয়ানমারে জঞ্জালের মধ্য থেকে কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধার করা গেছে, থাইল্যান্ডের বহুতল ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে মিলেছে প্রাণের স্পন্দন, জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ভূমিকম্পে মিয়ানমারে মৃত্যু ২ হাজার ছাড়িয়েছে, জীবিত উদ্ধার আরও ৪ জন
যদিও ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা সামরিক জান্তার শাসনে থাকা মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ এই উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তুলেছে।
“উদ্ধারকাজের জন্য সবজায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে। নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা বাধার কারণে ফ্রন্টলাইন এলাকাগুলোতে পৌঁছানো কঠিন,” রয়টার্সকে এমনটাই বলেছেন মিয়ানমারে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির এক প্রতিনিধি।
চীনের সিনহুয়া বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের কাছে থাকা মান্দালয়েও ধসে পড়া ভবনগুলো থেকে চারজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা এক নারী ও একটি মেয়েও রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিসিটিভির প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, লাল হেলমেট পরা চীনা উদ্ধারকর্মীরা মান্দালয়ের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে একজনকে জীবিত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে বের করে আনছেন। তাকে একটি বিশেষ কম্বলে মুড়ে ধ্বংসস্তুপ থেকে বের করে আনেন উদ্ধারকর্মীরা।
মিয়ানমারের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী দাবি করেছে, ভূমিকম্পের পরও সামরিক বাহিনী গ্রামগুলোর ওপর বিমান হামলা চালাচ্ছে। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ত্রাণ কার্যক্রমের স্বার্থে দেশটিতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।
মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সোমবার দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ৬৫-তে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে, আহতের সংখ্যা বলেছে প্রায় ৪ হাজার, নিখোঁজ ২৭০ জন। এদিন সামরিক জান্তা এক সপ্তাহের জাতীয় শোকও ঘোষণা করেছে।
ভূমিকম্পে মিয়ানমারে মৃত্যু ২ হাজার ছাড়িয়েছে, জীবিত উদ্ধার আরও ৪ জন
এদিকে মিয়ানমারের জান্তার বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মৃতের সংখ্যা ২ হাজার ২৮ জানিয়েছে।
বিদ্রোহী ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) বলেছে, ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার পর সোমবার পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার ৪১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
হতাহতদের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নেওয়ার পর দেশটিতে গণমাধ্যমের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
মৃতদের মধ্যে তিনজন চীনা নাগরিক রয়েছে বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে সতর্কও করেছেন। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের এক হিসাবে কেবল মিয়ানমারেই মৃত ১০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের ধাক্কা লাগা ব্যাংককে সোমবার ধসে পড়া একটি নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ধ্বংসাবশেষ থেকে আরও একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে ভবন ধসে ১২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে, দেশজুড়ে ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯ জনে। এখনও নিখোঁজ ৭৫ জন।
এখানে উদ্ধারকারীরা স্ক্যানিং মেশিন ও প্রশিক্ষিত কুকুরের সাহায্যে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তল্লাশি চালাচ্ছেন।
ব্যাংককের ডেপুটি গভর্নর তাবিদা কামলভেজ বলেছেন, “আমরা একটি এলাকায় প্রাণের সংকেত পেয়েছি, কিন্তু সেখানে পৌঁছানো কঠিন। আমাদের দ্রুত কাজ করতে হবে। ৭২ ঘণ্টা পর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যায়, তবে আমরা ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও থামবো না।”
সঙ্কট মোকাবেলায় চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডসহ প্রতিবেশী দেশগুলো মিয়ানমারে ত্রাণ সামগ্রী ও উদ্ধারকারী দল পাঠিয়েছে। সহায়তা পাঠিয়েছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও রাশিয়াও।
চীনের অনুসন্ধান ও উদ্ধার দলের প্রধান ইউয়ে সিন বলেছেন, “আমরা কতক্ষণ কাজ করলাম, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। সবচেয়ে জরুরি হলো, আমরা স্থানীয় মানুষদের আশার আলো দেখাতে পারছি কি না, তা।”
ভূমিকম্পে মিয়ানমারে মৃত্যু ২ হাজার ছাড়িয়েছে, জীবিত উদ্ধার আরও ৪ জন
জাতিসংঘ বলেছে, মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলে বেঁচে যাওয়া মানুষদের দ্রুত ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে তারা।
“মান্দালয়ে আমাদের দলগুলো নিজেরাই এই বিপর্যয়ের শিকার, কিন্তু তবুও তারা উদ্ধার কাজের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে,” বলেছেন মিয়ানমারে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার প্রতিনিধি নরিকো তাকাগি।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ‘মিয়ানমারভিত্তিক মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর’ মাধ্যমে ২০ লাখ ডলারের ত্রাণ সহায়তা দেবে। মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএইড)-এর একটি জরুরি দল মিয়ানমারে যাচ্ছে, যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের বড় ধরনের বাজেট কাটছাঁটের কারণে সংস্থাটি সঙ্কটের মুখে পড়েছে।
এদিকে, ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকটের মধ্যেও মিয়ানমারের শহর ও গ্রামগুলোতে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটির সামরিক বাহিনী। বিদ্রোহী গোষ্ঠী কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ) সামরিক জান্তার এমন কার্যকলাপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো—সেতু, মহাসড়ক, বিমানবন্দর ও রেলপথ—ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মানবিক সহায়তার প্রচেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে। সংঘাতের ফলে দেশটির অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে, ৩৫ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
“আমরা মান্দালয় এবং নেপিদোর বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপে ভরা জনপদ দেখতে পাচ্ছি। মানুষ এখনও খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছে, তারা বাড়িতে ফিরতে পারছে না, এমনকি খাবার রান্নার সুযোগও পাচ্ছে না,” বলেছেন রেড ক্রস কমিটির এক প্রতিনিধি।।
তিনি আরও বলেন, “যেসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো আর আগের মতো সেবা দিতে পারছে না, উপরন্তু সেগুলো নতুন রোগীদের চাপ সামলাতেও হিমশিম খাচ্ছে।”